এমবারের প্রতিবেদন

কয়লাকে টপকে বিদ্যুতের বড় উৎস এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি

প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে কয়লাকে পেছনে ফেলেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি।

দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে এ পরিবর্তন বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের এক বড় রূপান্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বখ্যাত এনার্জি থিংকট্যাংক এমবারের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের অংশ কমে মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে এসেছে। খবর কার্বন ক্রেডিটস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি কেবল একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বের একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। নবায়নযোগ্য শক্তির এ সাফল্যের মূল কারিগর সৌর ও বায়ু শক্তি। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের যে নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে, তার প্রায় ৯৯ শতাংশই পূরণ করেছে এ দুই উৎস। অর্থাৎ, বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লেও এর জন্য আর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়নি।

এমবারের‍ তথ্য বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে। ফলে সৌর ও বায়ুশক্তি এখন প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে। সৌর ও বায়ুশক্তির দ্রুত প্রসারের ফলেই বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এ উত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সৌরশক্তি। এক বছরেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬৩৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা, যা ইতিহাসে একক কোনো বিদ্যুৎ উৎসের জন্য সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে সোলার মডিউলের দাম ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে। ফলে অনেক দেশেই এখন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে সৌরশক্তি সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এমনকি বিশ্বের মোট নতুন বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই একাই পূরণ করেছে সৌরশক্তি।

এর সঙ্গে বায়ুশক্তি যোগ হয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজনীয়তাকে প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনেছে।

শুধু তা-ই নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের গতিও কমেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে জ্বালানি খাত থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় বৃদ্ধির এ হার বেশ মন্থর। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজারে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতি চীন ও ভারত। এমবারের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রায় ৫৫ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। একই সময়ে ভারতও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা উল্লেখ্যযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ১৪ শতাংশ অবদান রেখেছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের চীন ও ভারত উভয় দেশেই একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। কয়েক বছরের মধ্যে এমন ঘটনা আর ঘটেনি।

বর্তমানে চীন ও ভারত মিলিতভাবে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে দেশ দুটির পরিবর্তন পুরো বিশ্বের চিত্র বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (ইরেনা) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনে ২০২৫ সালে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বিশ্ব। গত বছর বিশ্বজুড়ে মোট ৬৯২ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে খাতটিতে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধির সিংহভাগই এসেছে সৌরশক্তি থেকে। গত বছর এ খাতে মোট ৫১১ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, যা মোট প্রবৃদ্ধির প্রায় ৭৫ শতাংশ। সৌরশক্তির পরেই রয়েছে বায়ুশক্তি, যা থেকে এসেছে ১৫৯ গিগাওয়াট। সম্মিলিতভাবে সৌর ও বায়ুশক্তি গত বছরের নিট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশ দখল করে রেখেছে।

সংস্থাটি জানায়, বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা ও জলবায়ু সংকট মোকাবেলার চাপ বাড়তে থাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এবং সম্প্রসারণ জোরদার হয়েছে।

এমবারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌর ও বায়ুশক্তির প্রবৃদ্ধি ছাড়া ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাত থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ আরো ২৩৬ মিলিয়ন টন বেশি হতো। নবায়নযোগ্য শক্তি কেবল চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং পরিবেশের দূষণ কমাতেও সরাসরি ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতা দেশগুলোকে নিজেদের জ্বালানিনীতি নিয়ে পুনরায় ভাবতে বাধ্য করছে। জীবাশ্ম জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার ও মূল্যের অস্থিতিশীলতা থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দেশ এখন দেশীয় এবং নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে এবং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে দেশগুলো এখন খাতটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াচ্ছে।

আরও